ভারতীয় সভ্যতার বিবর্তন: প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত এক মহাকাব্যিক যাত্রা
ভারতীয় সভ্যতা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং নিরন্তর প্রবাহমান সভ্যতা। এর বিবর্তন একটি বিশাল মহাকাব্যিক যাত্রা, যা প্রায় দশ হাজার বছর ধরে বহু যুগ, সংস্কৃতি, ধর্ম, সাম্রাজ্য এবং মতাদর্শের উত্থান-পতনের সাক্ষী। এই বিবর্তন শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রা, প্রযুক্তি, শিল্পকলা, দর্শন এবং আধ্যাত্মিক চেতনার নিরবচ্ছিন্ন রূপান্তরকেও নির্দেশ করে।
আমরা মানবসভ্যতার ইতিহাসকে মূলত তিনটি প্রধান প্রস্তরযুগে ভাগ করতে পারি:
১. প্রাচীন প্রস্তরযুগ (Palaeolithic Age): মানুষ ছিল মূলত খাদ্য-সংগ্রহকারী (Hunter-Gatherer), পাথরের রুক্ষ হাতিয়ার ব্যবহার করত।
২. মধ্য প্রস্তরযুগ (Mesolithic Age): এই যুগে শিকার ও খাদ্য-সংগ্রহের পাশাপাশি হাতিয়ার আরও সূক্ষ্ম ও ছোট হয় (Microliths), যা পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের এক নতুন স্তর।
৩. নব্য প্রস্তরযুগ (Neolithic Age): এটি ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। মানুষ খাদ্য-সংগ্রহকারী থেকে খাদ্য-উৎপাদনকারী-তে পরিণত হয়। কৃষি, পশুপালন এবং স্থায়ী গ্রামীণ জীবনের সূচনা হয়।
নব্য প্রস্তরযুগের শেষ দিক থেকেই মানুষ ধাতুর ব্যবহার শুরু করে, যা তাম্র-সভ্যতার (Chalcolithic Age) জন্ম দেয় এবং অবশেষে নগর সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করে।
১. প্রারম্ভিক কৃষি ও গ্রামীণ সভ্যতা: মেহেরগড়
নব্য প্রস্তরযুগের এক অসাধারণ নিদর্শন হল মেহেরগড় সভ্যতা।
আবিষ্কার ও অবস্থান:
১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জেন ফ্রাঁসোয়া জারিজ (Jean-François Jarrige) এবং রিচার্ড মিডো (Richard Meadow) মেহেরগড় সভ্যতা আবিষ্কার করেন।
স্থানটি বর্তমান পাকিস্তানের বালুচিস্তানের কাচ্চির সমতলভূমিতে, বোলান গিরিপথের কাছে অবস্থিত।
গুরুত্ব ও সময়কাল:
মেহেরগড় ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম কৃষিভিত্তিক জনবসতির সাক্ষ্য বহন করে।
এর চরম বিকাশের সময়কাল মোটামুটিভাবে ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।
আবিষ্কৃত সাতটি স্তরের মধ্যে প্রথম তিনটি স্তর (স্তর I, II, III) নব্য প্রস্তরযুগের গ্রামীণ জীবনের সুস্পষ্ট প্রমাণ দেয়।
সভ্যতার বৈশিষ্ট্য:
কৃষি ও পশুপালন: এই সভ্যতার মানুষ প্রথমদিকে শিকারবৃত্তি ও পশুপালন করত, কিন্তু ক্রমে তারা উন্নতমানের খাদ্যশস্য যেমন গম ও যব চাষ করতে শুরু করে। তারা গবাদি পশু, ভেড়া ও ছাগল পালন করত।
স্থাপত্য: তারা কাদা-ইট দিয়ে তৈরি আয়তক্ষেত্রাকার ঘর নির্মাণ করত, যার মধ্যে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য কামরা বা শস্যাগারও থাকত।
উত্তরণ: মেহেরগড় ছিল একটি গ্রামীণ সভ্যতা যা হরপ্পা সভ্যতার পূর্ববর্তী তাম্র-সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই সভ্যতার পতন ঘটে, কিন্তু এর কৃষি ও প্রযুক্তিগত উত্তরাধিকার সিন্ধু উপত্যকার দিকে প্রবাহিত হয়।
২. নগর বিপ্লব ও প্রথম শহুরে সভ্যতা: হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতা (৩০০০ - ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
হরপ্পা সভ্যতা বা সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা (Indus Valley Civilization) ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম নগর বিপ্লব (Urban Revolution) নিয়ে আসে।
আবিষ্কার ও বিস্তার:
১৯২২ খ্রিস্টাব্দে স্যার জন মার্শালের নেতৃত্বে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (মহেন-জো-দারো) এবং দয়ারাম সাহানি (হরপ্পা) এই সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কার করেন।
এই আবিষ্কার ভারতীয় ইতিহাসের প্রাচীনত্বকে মিশরীয়, মেসোপটেমীয় এবং ব্যাবিলনীয় সভ্যতার সমসাময়িক স্তরে উন্নীত করে।
সভ্যতার আয়তন ছিল প্রায় ২২ লক্ষ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা এটিকে প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম সভ্যতাগুলোর মধ্যে স্থান দেয়। এর কেন্দ্রগুলি পশ্চিম দিকে বালুচিস্তান থেকে পূর্ব দিকে উত্তরপ্রদেশের আলমগীরপুর, উত্তর দিকে জম্মু থেকে দক্ষিণ দিকে গুজরাটের লোথাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
নগর পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি:
পরিকল্পনা: হরপ্পার নগর পরিকল্পনা ছিল অবিশ্বাস্যভাবে উন্নত ও আধুনিক। প্রতিটি শহর দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত ছিল: সিটাডেল (Citadel) বা দুর্গ এবং নিম্ন নগর (Lower Town)।
রাস্তা ও পয়ঃপ্রণালী: রাস্তাগুলি ছিল সোজা ও গ্রিড বিন্যাসে (Grid System) একে অপরকে সমকোণে ছেদ করত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের উন্নত পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা— প্রতিটি বাড়ির নিজস্ব কূপ, স্নানাগার এবং ঢাকা নর্দমা ছিল যা মূল নর্দমার সঙ্গে যুক্ত থাকত।
স্থাপত্য: মহেন-জো-দারোর বৃহৎ স্নানাগার (Great Bath) এবং শস্যাগার (Great Granary) তাদের উন্নত স্থাপত্য এবং সামাজিক সংগঠনের প্রমাণ দেয়।
ধাতুর ব্যবহার: এই সভ্যতার মানুষ ব্রোঞ্জ (Bronze) ও তামার ব্যবহার জানত, তাই এটি ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা হিসেবে পরিচিত। তবে তারা লোহার ব্যবহার জানত না।
সমাজ, অর্থনীতি ও ধর্ম:
সমাজ: সমাজে মূলত তিনটি শ্রেণি ছিল— শাসক সম্প্রদায়, ধনী ব্যবসায়ী ও কারিগর, এবং শ্রমিক। নারীরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করত।
অর্থনীতি: যদিও সভ্যতাটি নগরকেন্দ্রিক ছিল, এর মূল ভিত্তি ছিল উন্নত কৃষি। তারা গম, যব, তিল, ডাল এবং সম্ভবত ধান চাষ করত। তারাই প্রথম তুলো উৎপাদন শুরু করে।
বাণিজ্য: হরপ্পার অর্থনীতি ছিল সমৃদ্ধ বাণিজ্য নির্ভর। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পাশাপাশি সুতিবস্ত্র, তুলা, কার্নেলিয়ান পুঁতি প্রভৃতি মেসোপটেমিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলত।
ধর্ম: তাদের ধর্মীয় জীবনে এক মিশ্র রূপ দেখা যায়:
মাতৃপূজা: অসংখ্য পোড়ামাটির মাতৃমূর্তি (Mother Goddess) পাওয়া গেছে, যা সমাজে মাতৃশক্তির উপাসনার প্রমাণ দেয়।
প্রোটো শিব: মহেন-জো-দারো-তে একটি সীলমোহরে পাঁচটি পশুদ্বারা পরিবৃত্ত হয়ে ধ্যানমগ্ন এক যোগীমূর্তি পাওয়া গিয়েছে, যাকে প্রত্নতত্ত্ববিদগণ 'Proto Shiva' (পশুপতি মহাদেব) বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রকৃতি পূজা: তারা গাছ (বিশেষত অশ্বত্থ), আগুন, জল, লিঙ্গ এবং যোনি পূজা করত।
পতন:
আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হরপ্পা সভ্যতার পতন হয়। এর সঠিক কারণ আজও বিতর্কিত, তবে একাধিক কারণের প্রভাবকে অনুমান করা হয়:
পরিবেশগত পরিবর্তন: তীব্র বৃষ্টিপাতের অভাব ও মরুভূমি বৃদ্ধি।
ভূমিকম্প ও বন্যা: সিন্ধুনদের বিধ্বংসী বন্যা।
নদীর গতিপথ পরিবর্তন: ঘর্ঘরা-হাকরা নদীর গতিপথ পরিবর্তন।
বহিরাগত আক্রমণ: অনেকে আর্যদের আক্রমণকে (ইন্দ্রের 'পুরন্দর' উপাধি) একটি কারণ হিসেবে মনে করেন।
৩. ইন্দো-আর্যদের আগমন ও বৈদিক সভ্যতা (১৫০০ - ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
হরপ্পা-পরবর্তী যুগে ইন্দো-আর্য জাতিগোষ্ঠীর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে যে নতুন সংস্কৃতি ও জীবনধারা গড়ে ওঠে, তা-ই বৈদিক সভ্যতা নামে পরিচিত, যার ভিত্তি ছিল 'বেদ'।
আর্যদের আদি বাসস্থান ও বিস্তার:
আর্যদের আদি বাসস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, অধিকাংশ পন্ডিত মনে করেন তারা মধ্য এশিয়া বা ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চল থেকে ভারতে এসেছিল। ভারতে তারা প্রথমে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে (পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম ভারত) বসতি স্থাপন করে।
বৈদিক সাহিত্য:
আর্যদের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে পবিত্র সাহিত্য হল 'বেদ' (শ্রুতি), যা প্রধানত চারটি ভাগে বিভক্ত:
১. ঋগ্বেদ: প্রাচীনতম বেদ, যা মূলত স্তোত্র ও প্রার্থনার সংকলন।
২. সামবেদ: প্রধানত গানের সংকলন।
৩. যজুর্বেদ: যজ্ঞের নিয়ম ও পদ্ধতির বিবরণ।
৪. অথর্ব বেদ: যাদু, মন্ত্র, এবং রোগ নিরাময়ের পদ্ধতি।
এগুলি ছাড়াও বৈদিক সাহিত্যে রয়েছে ব্রাহ্মণ (যজ্ঞের ব্যাখ্যা), আরণ্যক (বনে বসে রচিত ধর্মীয় আলোচনা), এবং উপনিষদ (ব্রহ্ম ও আত্মার দার্শনিক আলোচনা)।
রাজনৈতিক জীবন:
ঋগ্বৈদিক যুগ (১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ): এই যুগে আর্যরা ছিল যাযাবর থেকে অর্ধ-যাযাবর জীবনযাপনকারী।
রাজনৈতিক একক: পরিবার (কুল) → গ্রাম (গ্রামণী) → বিশ (বিশপতি) → জন (গোষ্ঠীভিত্তিক রাজ্য)।
শাসন: রাজা (রাজন) ছিলেন প্রধান। তাকে সাহায্য করত দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান: সভা (বয়স্ক ও অভিজাতদের পরিষদ) ও সমিতি (সাধারণ মানুষের পরিষদ)।
পরবর্তী বৈদিক যুগ (১০০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ): স্থায়ী বসতি স্থাপিত হয় এবং 'জন' থেকে বৃহৎ আঞ্চলিক রাজ্য 'জনপদ' গড়ে ওঠে। রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং তিনি 'সম্রাট' বা 'একরাট' উপাধি গ্রহণ করেন। সভা ও সমিতির গুরুত্ব হ্রাস পায়।
সামাজিক জীবন ও চতুরাশ্রম:
নারী স্থান: ঋগ্বৈদিক সমাজে নারীদের স্থান ছিল উচ্চে। তারা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিত। সতীদাহ বা বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল না। বিশ্ববারা, লোপামুদ্রা, ঘোষা প্রমুখ ছিলেন এই যুগের বিদুষী নারী।
বস্ত্র ও খাদ্য: আর্যরা সুতি ও পশমের বস্ত্র ব্যবহার করত। চাল, গম, যব, দুধ, মাংস (পশুর মাংস), ফলমূল তাদের খাদ্য ছিল।
জাতিভেদ: প্রাথমিকভাবে কর্মের ভিত্তিতে আর্য সমাজে চারটি শ্রেণি (বর্ণ) ছিল:
১. ব্রাহ্মণ: পূজা ও পুরোহিতের কাজ।
২. ক্ষত্রিয়: যুদ্ধ ও শাসন।
৩. বৈশ্য: কৃষি ও বাণিজ্য।
৪. শূদ্র: উপরের তিন বর্ণের সেবা।
পরবর্তী বৈদিক যুগে এই বর্ণভেদ কঠোর, জন্মভিত্তিক এবং বংশানুক্রমিক হয়ে ওঠে।
চতুরাশ্রম প্রথা: ব্যক্তিগত জীবনে আদর্শ জীবনধারণের জন্য চারটি স্তর (আশ্রম) ছিল:
ক) ব্রহ্মচর্য: শিক্ষা গ্রহণ ও সংযম।
খ) গার্হস্থ্য: বিবাহ, পরিবার ও সংসার।
গ) বানপ্রস্থ: সংসার ত্যাগ করে বনে প্রস্থান।
ঘ) সন্ন্যাস: মোক্ষ লাভের জন্য চরম ত্যাগ।
অর্থনীতি ও ধর্ম:
অর্থনীতি: কৃষি ছিল প্রধান বৃত্তি, তবে পশুপালন (বিশেষত গরু, যা ছিল সম্পদের প্রতীক) ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তি। তারা নিষ্ক ও মনা নামক স্বর্ণমুদ্রা ব্যবহার করত।
ধর্ম: ঋগ্বৈদিক যুগে প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির উপাসনা করা হত। দেবতারা ছিলেন মূলত প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি:
দেবরাজ ইন্দ্র: বৃষ্টি ও যুদ্ধের দেবতা।
অগ্নি: আগুন ও মানুষের সঙ্গে দেবতাদের সংযোগ স্থাপনকারী।
বরুণ: জল ও শৃঙ্খলা।
মরুৎ: ঝড় ও বাতাস।
অন্যান্য: সূর্য, অদিতি, উষা। যজ্ঞ ছিল উপাসনার প্রধান মাধ্যম।
৪. প্রতিবাদী আন্দোলন ও বৌদ্ধ-জৈন ধর্মের উত্থান (৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
পরবর্তী বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একাধিপত্য, ব্যয়বহুল যাগযজ্ঞ, পশুবলি এবং অনুষ্ঠান-সর্বস্বতা সমাজে এক গভীর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সমাজে নিম্নবর্ণের মানুষ এবং অর্থ সম্পদে বলীয়ান হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক মর্যাদা বঞ্চিত বৈশ্য সম্প্রদায় সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্য উন্মুখ ছিল। এই পটভূমিতেই প্রায় ৬ষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন হিসাবে বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম এবং অন্যান্য কিছু ধর্ম (যেমন আজীবিক) জন্ম নেয়।
জৈনধর্ম
জৈনধর্মের মূল ভিত্তি ছিল কঠোর নৈতিকতা ও অহিংসা।
তীর্থঙ্কর: জৈনধর্মের ২৪ জন তীর্থঙ্করের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ঋষভদেব: প্রথম তীর্থঙ্কর।
পার্শ্বনাথ: ২৩তম তীর্থঙ্কর। তিনি জৈনধর্মের মূল চারটি আদর্শ বা মন্ত্রের কথা বলেন, যা চতুর্যাম নামে পরিচিত: (১) অহিংসা, (২) সত্য, (৩) অচৌর্য (চুরি না করা), (৪) অপরিগ্রহ (সম্পত্তি সঞ্চয় না করা)।
বর্ধমান মহাবীর: আনুমানিক ৫৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বৈশালির কাছে কুন্দগ্রামে তাঁর জন্ম। পিতার নাম সিদ্ধার্থ, মাতা ত্রিশলা। ২৯ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে ১২ বছর কঠোর সাধনার পর তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। ৪৬৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ৭২ বছর বয়সে তিনি পাবা নগরী-তে অনশনের মাধ্যমে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করেন।
পঞ্চমহাব্রত: মহাবীর চতুর্যামের চারটি নীতির সঙ্গে পঞ্চম নীতি ব্রহ্মচর্য যোগ করে পঞ্চমহাব্রত প্রতিষ্ঠা করেন।
ত্রিরত্ন (Three Jewels): আত্মার মুক্তির জন্য মহাবীর তিনটি নীতি পালনের কথা বলেন: (১) সম্যক বিশ্বাস (Right Faith), (২) সম্যক জ্ঞান (Right Knowledge), (৩) সম্যক আচরণ (Right Conduct)।
বিশ্বাস: জৈনধর্ম কর্মফল ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী। তাদের কাছে প্রাণীহত্যা মহাপাপ।
দিগম্বর ও শ্বেতাম্বর: খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে জৈনরা দুই ভাগে বিভক্ত হন:
দিগম্বর: ভদ্রবাহু-র নেতৃত্বে দক্ষিণ ভারতে যান এবং মহাবীরের অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলতেন, কোনো বস্ত্র পরিধান করতেন না।
শ্বেতাম্বর: স্থূলভদ্র-র নেতৃত্বে মগধেই থেকে যান এবং শ্বেতবস্ত্র পরিধান করতেন।
বৌদ্ধধর্ম
বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধ সাম্য ও মধ্যম পন্থার পথ দেখিয়েছিলেন।
গৌতম বুদ্ধ (সিদ্ধার্থ): নেপালের তরাই অঞ্চলে অবস্থিত কপিলাবস্তু-র শাক্য রাজা শুদ্ধোদন-এর পুত্র। তাঁর জন্ম আনুমানিক ৫৬৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
মহাভিনিষ্ক্রমণ: ২৯ বছর বয়সে পুত্র রাহুল জন্মের পর তিনি সংসার জীবনের মায়া ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এই গৃহত্যাগের ঘটনা 'মহাভিনিষ্ক্রমণ' নামে পরিচিত।
বুদ্ধত্ব লাভ: গয়ার কাছে নৈরঞ্জনা নদী তীরে একটি অশ্বত্থ গাছের নীচে দীর্ঘ সাধনার পর তিনি দিব্যজ্ঞান (বোধি) লাভ করেন এবং 'বুদ্ধ' নামে পরিচিত হন।
ধর্ম প্রচার: প্রায় ৪৫ বছর ধরে তিনি ধর্ম প্রচার করেন এবং ৮০ বছর বয়সে কাশিনগরে (কুশিনগর) তাঁর মহাপরিনির্বাণ ঘটে।
চার আর্য সত্য: দুঃখের কারণ ও তা থেকে মুক্তির জন্য বুদ্ধ চারটি সত্যের কথা বলেন: (১) জগৎ দুঃখময়, (২) দুঃখের কারণ আছে (তৃষ্ণা), (৩) দুঃখ নিবারণ করা যায়, (৪) দুঃখ নিবারণের উপায় হল অষ্টাঙ্গিক মার্গ।
অষ্টাঙ্গিক মার্গ: নির্বাণ লাভের জন্য আটটি পথের কথা বলেন: সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি।
জনপ্রিয়তা: ড. রমিলা থাপার-এর মতে, "Buddhism certainly made its appeal to the lower orders of society..."— বৌদ্ধধর্ম সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছিল, কারণ এটি ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোরতা বর্জন করে মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের কথা বলেছিল।
৫. সাম্রাজ্যের উত্থান: মহাজনপদ থেকে মগধ সাম্রাজ্য (৬০০ - ৩২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দে উত্তর ভারতে আঞ্চলিক রাষ্ট্র বা জনপদগুলি আরও শক্তিশালী ও বৃহৎ হয়ে ষোড়শ মহাজনপদ নামে পরিচিত হয়। এদের মধ্যে কোশল, অবন্তী, বৎস এবং মগধ ছিল প্রধান। অবশেষে, মগধ তার ভৌগোলিক সুবিধা, সামরিক শক্তি এবং শক্তিশালী রাজবংশের (হর্যঙ্ক, শিশুনাগ, নন্দ) কারণে ভারতে প্রথম বৃহৎ সাম্রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
৬. মৌর্য সাম্রাজ্য: ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় রাষ্ট্র (৩২২ - ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দ বংশকে পরাজিত করে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা ভারতীয় ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগ।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য: গ্রিক শাসক সেলিউকোস নিকেটরকে পরাজিত করেন এবং বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
অশোক: মৌর্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শাসক। কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তিনি যুদ্ধনীতি ত্যাগ করে ধর্ম নীতি (ধম্ম) গ্রহণ করেন। তাঁর শিলালিপি ও স্তম্ভলিপিগুলি প্রথম লিখিত প্রশাসনিক ও নৈতিক উপদেশের উৎস।
প্রশাসন: কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক স্তরে সুসংগঠিত প্রশাসন ছিল, যার বিবরণ কৌটিল্য বা চাণক্যের 'অর্থশাস্ত্র'-এ পাওয়া যায়।
৭. উত্তর-মৌর্য ও গুপ্ত যুগ: শিল্প, বিজ্ঞান ও স্বর্ণযুগ (২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ - ৫০০ খ্রিস্টাব্দ)
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতে বিদেশি শক্তির আগমন হয় (যেমন ইন্দো-গ্রিক, শকরা, কুষাণরা)। এই সময়কালে কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক ছিলেন উল্লেখযোগ্য, যিনি মহাযান বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং গান্ধার শিল্পকলার বিকাশ ঘটান।
এরপর আসে গুপ্ত যুগ (৩২০ - ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ), যাকে ভারতীয় ইতিহাসের 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়।
সামুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (বিক্রমাদিত্য) ছিলেন প্রধান শাসক।
সাহিত্য ও বিজ্ঞান: সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের চরম বিকাশ হয় (কালিদাস)। আর্যভট্ট ও বরাহমিহির জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতে যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। দশমিক প্রথা ও শূন্যের ধারণা এই যুগেই বিকশিত হয়।
শিল্পকলা: অজন্তা গুহাচিত্র এবং দেবগড়ের দশাবতার মন্দিরের মতো স্থাপত্যে ভারতীয় শিল্পের উচ্চ মান প্রতিফলিত হয়।
৮. প্রাচীন যুগের সমাপ্তি ও মধ্যযুগের সূচনা: হর্ষ ও পাল-সেন পর্ব
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারত বহু ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সপ্তম শতকে হর্ষবর্ধন উত্তর ভারতে কিছুটা রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করলেও, তাঁর মৃত্যুর পর আবার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীভূত হয়।
পূর্ব ভারতে পাল রাজবংশ (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক) এবং পরে সেন রাজবংশ ভারতীয় সভ্যতার আঞ্চলিক রূপকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পালরা বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা এবং নালন্দার মতো শিক্ষাকেন্দ্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেন আমলে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থান এবং বাংলা সাহিত্যের বিকাশ শুরু হয়।
৯. দিল্লি সুলতানি ও মুঘল সাম্রাজ্য: ইন্দো-ইসলামিক সংস্কৃতির সংমিশ্রণ
ত্রয়োদশ শতকে ভারতে মুসলিম শাসনের সূচনা হয় এবং মধ্যযুগের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
দিল্লি সুলতানি (১২০৬-১৫২৬): এই সময়ে কুতুব মিনার, আলাই দরওয়াজার মতো ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের বিকাশ হয়। এই সময় ভারতে সূফি ও ভক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়, যা হিন্দু ও মুসলিম ধর্মীয় চিন্তাধারার মধ্যে সেতু স্থাপন করে।
মুঘল সাম্রাজ্য (১৫২৬-১৮৫৭): বাবর, আকবর, শাহজাহান ও ঔরঙ্গজেব এই সাম্রাজ্যকে শিখরে নিয়ে যান।
আকবরের দিন-ই-ইলাহি ধর্মনিরপেক্ষতার এক উদাহরণ।
স্থাপত্য: তাজমহল, লালকেল্লা, ফতেপুর সিক্রির মতো স্থাপত্য ইন্দো-ইসলামিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
অর্থনীতি: একটি বিশাল ও সুসংগঠিত রাজস্ব ব্যবস্থা (মনসবদারি) এবং বিশ্ব বাণিজ্যে ভারতের আধিপত্য ছিল।
১০. আধুনিক যুগের সূচনা: ঔপনিবেশিক শাসন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম
অষ্টাদশ শতকের পর মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা এবং ইউরোপীয় বণিকদের আগমন (বিশেষত ইংরেজ) ভারতীয় সভ্যতার গতিপথ পরিবর্তন করে।
ব্রিটিশ শাসন (১৭৫৭ - ১৯৪৭): প্রায় ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন ভারতীয় অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজকে আমূল পরিবর্তন করে।
প্রভাব: রেলপথ, টেলিগ্রাফ, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন, কিন্তু একইসঙ্গে ভারতের সম্পদ লুণ্ঠন এবং কুটির শিল্পের পতন ঘটে।
সংস্কার আন্দোলন: রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দের মতো সমাজ সংস্কারকদের নেতৃত্বে ভারতীয় সমাজে নবজাগরণ আসে এবং প্রাচীন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়।
স্বাধীনতা আন্দোলন: মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখের নেতৃত্বে অহিংসা ও সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।
১১. আধুনিক ভারত: গণতন্ত্র ও বৈচিত্র্যের যুগ
প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৭ সালের পর ভারত একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
অর্থনৈতিক বিবর্তন: স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ভারত মিশ্র অর্থনীতির মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশন ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে হাঁটে। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণ ভারতের অর্থনীতিকে বিশ্ব মঞ্চে নিয়ে আসে।
প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান: তথ্য প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা (ISRO), এবং পারমাণবিক শক্তিতে ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।
ভারতীয় সভ্যতার এই দীর্ঘ বিবর্তন— প্রাগৈতিহাসিক গ্রামীণ জীবন থেকে নগর বিপ্লব, ধর্মীয় ও দার্শনিক গভীরতা থেকে সাম্রাজ্যের উত্থান, সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ থেকে আধুনিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা— প্রমাণ করে যে এটি একটি স্থিতিশীল নয়, বরং একটি নিরন্তর প্রবাহমান, অভিযোজনশীল এবং বহুত্ববাদী সভ্যতা, যা তার প্রাচীন শিকড় এবং আধুনিক আকাঙ্ক্ষাগুলির মধ্যে এক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে।

Comments
Post a Comment